আজ || শনিবার, ১৫ Jun ২০২৪
শিরোনাম :
  খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে ইদজামাত আয়োজনের প্রস্তুতি পরিদর্শনে সিটি মেয়র       খুলনায় ঈদের প্রধান জামাত সার্কিট হাউজ মাঠে সকাল ৮টায়       পুত্রবধূর সঙ্গে ঝগড়া করে পুকুরে পড়ে শাশুড়ির মৃত্যু       নিউজিল্যান্ডকে বিপদে ফেলে সুপার এইটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ       নগরীতে ইজিবাইক চালক রায়হান হত্যাকান্ডের মূল রহস্য উন্মোচন : দুই ঘাতক গ্রেফতার       নাড়ির টানে ঘরে ফিরছে মানুষ       যশোরে আইনজীবীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেত্রীর শ্লীলতাহানির মামলা       স্বাভাবিক জীবনে আসা বনদস্যুদের মাঝে র‌্যাবের ঈদ সামগ্রী বিতরণ       ঘুমন্ত মায়ের কোল থেকে শিশু চুরির অভিযোগ       এই সংগ্রাম দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার : মির্জা ফখরুল    
 


হুমায়ূন কবীর বালু সাহেবের অমৃত কিছু বাণী এবং আমি

প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে সাংবাদিকতার ধরণ, সংবাদ পরিবেশনের ঢং। প্রতি মুহূর্তে বদলে যাওয়া সাংবাদিকতার উপর দাঁড়িয়ে পাঠক সমাজের চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী পত্রিকার পাতা ভরে সংবাদ বের করার অনন্য এক কারিগর ছিলেন খুলনার গণ মানুষের প্রিয় ব্যক্তিত্ব জনাব হুমায়ূন কবীর বালু। দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলা প্রতিনিধি হবার সুবাদে বহুবার তাঁর কাছাকাছি অনেকবার যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। একদিন জন্মভূমি ভবনে অনুষ্ঠিত প্রতিনিধি সমে¥লনে আমি বালু সাহেবকে বলেছিলাম-‘পেপারটা একটু রঙ্গিন করা যায় না? প্রশ্নের জবাবে উনি আমায় উত্তর দিয়েছিলেন “জাহিদ- কালো মেয়েদের কি বিয়ে হয়না?” কথাটি আজও আমার হৃদয়ে দাগ কাটে। একজন মানুষ হিসেবে যতগুলো গুণ অর্জন করা দরকার,তার সবগুলো ছিল কিনা জানিনা তবে অনেক বেশি গুণে গুণান্বিত ছিলেন তিনি। ১০ অক্টোবর ২০০৩ সাল। সাতক্ষীরার দৃষ্টিপাত ভবনে বসেছিল দৈনিক দৃষ্টিপাত পত্রিকার সাংবাদিকদের মিলন মেলা। এখানে সাতক্ষীরায় কর্মরত অধিকাংশ সাংবাদিকরাই উপস্থিত ছিলেন। দৈনিক দৃষ্টিপাত পত্রিকার ২য় বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ক্ষণজন্মা পুরুষ জনাব হুমায়ূন কবীর বালু, সেই অনুষ্ঠানে তাঁর সফর সঙ্গী হিসেবে আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি,সাতক্ষীরা পৌরসভার চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনুষ্ঠানের ২য় পর্ব শুরু হয় বিকাল ৩ টায়। প্রথমে পরিচয় পর্ব। পরিচয় পর্বে নিজের পরিচয় দেবার সময় প্রায় সবাই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বালু সাহেবকে নানান বিশেষণে বিশেষায়িত করেন। কেউ বলেন জনপ্রিয় সাংবাদিক, কেউ বলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবার কেউ কেউ বললেন সাংবাদিক অভিভাবক। একজন বড় মাপের মানুষের গভীর আন্তরিকতা দেখে সেদিন গতানুগতিক শিক্ষা ভুলে নতুন শিক্ষায় দীক্ষিত হয়েছিলাম। একজন সাংবাদিক হিসেবে সেদিন হুমায়ূন কবীর বালুর মতো মানুষের সফর সঙ্গী হয়ে তার সংস্পর্শে যেতে পেরে অল্পক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে ধন্য মনে করেছিলাম। আবেগে আপ্লুত হয়ে সেদিন নিজেকে আরেকবার আবিস্কার করলাম। মুহূর্তেই ভাবনার আকাশে বিচরণ করেছিলাম, আমরা যারা দু’দিন সাংবাদিকতায় প্রবেশ করে, সামান্য লিখতে শিখে, মানুষকে মানুষ বলতে ভুলে যাই, নিজেদের অন্য জাতের মানুষ ভাবতে শুরু করি, হয়ে যাই অন্য জাতের মানুষ। সাংবাদিক বলতে যেন নিজের ভাবটা পরিবর্তন হয়ে যায়। পোষাকও পরিবর্তন করি প্রতিনিয়ত। চোখে চশমা, হাতে ঘড়ি , কাঁধে ক্যামেরা, পকেটে অন্তত: ২টা মোবাইল, ঘাড়ে ব্যাগ আর হাতে একটা সুদৃশ্য ডায়েরি না থাকলে যেন সাংবাদিক স্টাইল কমে যায়। আর মোটর সাইকেলে প্রেস লিখতে পারলেই নিজেকে আরও ধন্য মনি করি!
প্রচন্ড গরমে বসে যখন এ লেখা লিখছি ঠিক তখনি মনে পড়ে ১৮ বছর আগে দৃষ্টিপাতের সেই অনুষ্ঠানের দৃশ্য। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে বালু সাহেবকে একজন বাতাস করতে চাইলে তিনি নিজেই বাতাস দিচ্ছিলেন নিজেকে। এই সেই বালু সাহেব? ভাবতে যেন কষ্ট হচ্ছিল। গল্পে শোনা বালু এবং বাস্তবে দেখা বালুকে মেলাতে অনেক দেরি হলো। প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে অনেক কিছু বললেন। তাঁর কথার মর্ম এমন ছিল-‘সাংবাদিকতা আরাম-আয়েশ এবং অহংকারে গদ গদ হবার মতো কোন পেশা নয়। সাংবাদিকতা হলো দায়িত্ব পালনের কঠিন এক পেশা। সবাই এ পেশায় আসতে পারেনা, আসলেও বেশিদিন থাকেনা, বেশিদিন থাকলেও নিবেদিত থাকেনা, আর নিবেদিত থাকলেও ভয় থাকে। সাংবাদিকতা করতে গেলে সংবাদ লেখার নিয়ম-কানুন ও কৌশল জানতে হয়। ছক বাঁধা নিয়মে বন্দি না থেকে নিজস্ব স্টাইলও বের করা যেতে পারে। সাংবাদিকতা করতে হলে প্রচুর বই পড়তে হয়। পত্রিকার রিপোর্ট খুটে খুটে পড়তে হয়। আমি একটা রিপোর্ট পাঠালাম অথচ সেটি পত্রিকায় ছাপানো হলোনা। কেন হলোনা, নিজের পত্রিকা পড়ে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একেক পত্রিকা ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় সংবাদ পরিবেশন করে। সেখানে আার পত্রিকা কোন স্টাইল অবলম্বন করছে, আমার লেখার ধরণ কেমন হলে নিয়মিত নিউজ পরিবেশন করা হবে ইত্যাদি কথা বলেছিলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিন সেইসব অমৃত বাণী মনে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। তিনি আরও বলেছিলেন, সার্বক্ষণিক মরে যাবার, সন্ত্রাসী হামলার কিংবা পুলিশের হাতে গ্রেফতার এমনকি আদালতের কাঠগড়ায় যাবার প্রস্তুতি নিয়ে সাংবাদিকতায় নামতে হয়। এ পথ মোটেই মসৃণ নয়। কথার ফাঁকে তিনি একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন,‘ এখনও আমি ভাল সংবাদ লিখতে পারিনা, সহায়তা নিতে হয় আমার ছেলের। কারণ আমি সাংবাদিকের ঘরের সাংবাদিক নই, আমার পুত্র সাংবাদিকের ঘরের সাংবাদিক। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন ছাত্র’।
এসব কথা শুনে আমাদের অনেকেরই চোখ ছানাবড়া অবস্থা। প্রয়াত সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বালু’র সেই সুযোগ্য পুত্র জনাব আসিফ কবীর দীর্ঘ ১০ বছর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব হিসেবে দীর্ঘদিন সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। পরবর্তীতে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির মিডিয়া কনসালটেন্ট হিসাবে নিয়োগ পান।
যাই হোক সাংবাদিক অভিভাবক যার খ্যাতি, সেই যদি সংবাদ না লিখতে পারেন তাহলে যারা হাতে খড়ি নিচ্ছি আমরা কি? আমরা হলাম সংবাদ কর্মী। নিজেকে যতই সাংবাদিক বলি না কেন আমরা আসলে সাংবাদিক নই। কারণ সাংবাদিক হতে হলে যা পড়তে হয় আমরা তা কোনদিন পড়িনি, পড়ার সুযোগও পাইনি। হয়তো বালু সাহেবের বক্তৃতার আপাদমস্তক বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারা সম্ভব যে, তিনি কি বলেছেন, কি বলতে চেয়েছেন, কি করতে বলেছেন আমাদেরকে। আমরা সেদিন অনেকেই তাঁর কথা বুঝেছি, অনেকেই বুঝিনি। আমরা বুঝেছি তিনি ছিলেন খুবই বড় মাপের একজন মানুষ। একাধারে পিতা, অভিভাবক, রাজনীতিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, সমাজসেবক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, শিক্ষাবিদ ইত্যাদি। আরেকটি কথা না বললেই নয়, সম্ভবত: ২০০৩ সালে সাতক্ষীরার তালার এক প্রভাবশালী নেতা সংবাদ সংক্রান্ত ব্যাপারে মামলা করে দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক ও প্রকাশক হুমায়ূন কবীর বালু এবং সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি মোঃ মোজাফ্ফর রহমানের নামে। সংগত কারণেই সাতক্ষীরা আদালতে হাজিরা দিতে আসেন বালু সাহেব। সেদিন বালু সাহেব আসার খবরে সাতক্ষীরা আদালত চত্বরে ঢল নেমেছিল সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সাধারণ মানুষের। উক্ত মামলায় জয়ী হয়ে ফুলের মালা গলায় নিয়ে বীরদর্পে খুলনায় ফিরেছিলেন প্রতিথযশা সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বালু। তিনি ২০০৯ সালে সাংবাদিকতায় (মরণোত্তর) একুশে পদকে ভূষিত হয়ে দেশবাসীকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়ে আবার প্রমাণ করেছিলেন তাঁর তুলনা শুধুই তিনি।
২০০৪ সালের ২৭ জুন তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে এতটাই আহত হয়েছিলাম যা আমার কোন আপনজনের মরণেও হইনি। ভাবতেই বড় কষ্ট লাগছিল মেনে নিতে তাঁর অপ্রত্যাশিত মৃত্যুকে। তাৎক্ষনিক ছুটে গিয়েছিলাম খুলনায়। সাথে ছিল বন্ধুবর শেখ দীন মাহমুদ (কপিলমুনি প্রতিনিধি, জন্মভূমি) এবং মোঃ মহাসীন আলী (পাটকেলঘাট প্রতিনিধি)। সেদিন খুলনার রাজপথে দেখেছিলাম শোকার্ত মানুষের মিছিল। জীবিত হুমায়ূন কবীর বালুর চেয়ে মৃত হুমায়ূন কবীর বালু যে কত বেশি জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী মানুষ তা সেদিন দেখেছিলাম। সন্ধ্যায় তালায় ফিরে এসে প্রথমে সে সময়ের কর্মস্থল রিপোটার্স ক্লাবে তুলেছিলাম কালো পতাকা, রাস্তায় নেমে করেছিলাম মৌন মিছিল। সেদিন মুখে কালো কাপড় বেঁধে মিছিল করে বুঝিয়েছিলাম আমরা বন্দী। আমাদের মুখ খুলতে দেয়া হচ্ছেনা। প্রতিবাদ সভা করেছিলাম। করেছিলাম মিলাদ ও দোয়ানুষ্ঠান। কালো কাপড়ের ব্যানারে লিখেছিলাম “আমরা বিচার পাইনা, তাই বিচার চাইনা।”
আজ ২৭ জুন ২০২১ বালু সাহেবের শাহাদৎ বরণের ১৭ বছর পূর্তি হচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে এই হত্যা মামলার সব আসামীই খালাস পেয়েছে। বালু সাহেবের পরিবারের মতো আমাদেরও একই প্রশ্ন “সব আসামী খালাস পেল, তবে বালু’র খুনি কারা?” তবে এ বছর হুমায়ুন কবীর বালু হত্যা মামলার বিস্ফোরক অংশের রায়ে পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছে আদালত।
সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে বালু সাহেবকে হত্যা করে তাঁর আদর্শকে মুছে ফেলতে পারেনি। ব্যক্তি বালু হয়তো চলে গেছেন কিন্তু তাঁর নীতি ও আদর্শকে চলার পথের পাথেয় করে তারই যোগ্য উত্তরসূরী আসিফ কবীর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দৈনিক জন্মভূমি ও পদ্মার এপারের একমাত্র সান্ধ্য দৈনিক রাজপথের দাবীকে। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই বালু সাহেবকে, তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। এই সুযোগে আরও স্মরণ করি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত শহীদ সাংবাদিক মানিক সাহা, স.ম আলাউদ্দীন, সাইফুল আলম মুকুল, শামছুর রহমান, রশীদ খোকন, শেখ বেলাল উদ্দীনসহ নিহত সকল সাংবাদিককে। সাথে সাথে সকল সাংবাদিক হত্যার বিচার প্রার্থণা করছি। পরিশেষে নিহত সাংবাদিকদের পরিবার-স্বজনদের আপন মানুষ হারানোর শোক শক্তিতে পরিণত হোক এই কামনা করি। (লেখক- তালা উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক জন্মভূমি)।


Top