স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জননেত্রী শেখ হাসিনার সমর্থন

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : সোমবার, ৩১ মে, ২০২১

বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ফিলিস্তিনে একটি বাড়ির নামকরণ করা হয়েছে। গত ১২ মে ঢাকায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত ইউসেফ এস ওয়াই রমজান এমন তথ্য জানিয়েছেন। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। শেখ হাসিনাই সম্ভবত একমাত্র বিশ্বনেতা যার প্রতি ফিলিস্তিনি জনগণ এই ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতাবোধ দেখিয়েছে। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করে যাওয়া ফিলিস্তিনি জনগণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও আন্তরিক সমর্থন পেয়েছিল। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর ইসরাইল স্বীকৃতি দিতে চাইলেও বঙ্গবন্ধু তা গ্রহণ করেননি, কারণ যে রাষ্ট্রটি নিজেই একটি দখলদার রাষ্ট্র এবং আরেকটি জাতির স্বাধীনতার দাবীকে জোরজুলুম দ্বারা দাবিয়ে রেখেছে, বঙ্গবন্ধু তাদের কাছ থেকে নিজ দেশের স্বীকৃতি চাননি। তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সেই দাবীর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন। সে কারণেই প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরের ফিলিস্তিনের প্রতি অব্যাহত সমর্থন জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গত ৫০ বছরে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি।বাংলাদেশে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ এস ওয়াই রামাদান বলেছেন, ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের যে আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, তা বিশ্বে বিরল। তিনি নিজে খুব কম দেশেই এমন ভালোবাসা দেখেছেন। ফিলিস্তিনের জনগণ বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেরুজালেমে মুসলমানদের পবিত্র মসজিদ আল-আকসা প্রাঙ্গণে সম্প্রতি ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের যেকোনো স্থানে এ ধরনের জঘন্যতম হামলা বন্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়কে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমরা হামলায় হতাহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক এবং আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের যেকোনো দেশে এ ধরনের জঘন্যতম হামলার অবসানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’শেখ হাসিনা চিঠিতে আরও লিখেছেন, ‘আমার দেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আমি আল-আকসা মসজিদ এলাকায় বর্বরোচিত হামলায় নিরীহ মুসল্লি ও সাধারণ জনগণের হতাহতের ঘটনায় দুঃখ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছি।’প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।শেখ হাসিনা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সে দেশের সরকার ও জনগণের লক্ষ্য অর্জনে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।

ফিলিস্তিনের সঙ্গে আমাদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক শুধু ধর্মের ভিত্তিতে নয়; আমরা যখন তাদের মতো দুর্ভোগের শিকার হচ্ছিলাম তখন ফিলিস্তিনের জনগণ আমাদের সমর্থন-সহযোগিতা দিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণ যখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, তখন ফিলিস্তিনের জনগণ বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দিয়েছিল। তখন তারা তাদের সংবাদপত্রগুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাসংগ্রামের খবর ব্যাপকভাবে প্রকাশ করেছে। খুব কম দেশই কিন্তু তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এরপর ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক তৈরি হয়।

ফিলিস্তিন, বিশেষ করে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ১৯৭১ সাল থেকে। আরব দেশগুলোর বেশির ভাগই যখন দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন ফিলিস্তিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করে। বাংলাদেশ সব সময় ইসরাইলের দখলদারির নিন্দা এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়ে আসছে। ১৯৭৪ সালে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াসির আরাফাত প্রথম দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছিলেন। এরপর ইয়াসির আরাফাত বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সফর করেন। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সফর করেন।সাম্প্রতিক সংকটেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফিলিস্তিনকে ৫০ হাজার ডলার সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন।

বিশ শতকেরগোড়ার দিকে ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদিরা ব্যাপক বিদ্বেষ-নির্যাতনের শিকার হয়েইউরোপের বাইরে কেবলমাত্র ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ইহুদিবাদী আন্দোলন শুরু করে।সেই সময় তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা ফিলিস্তিন মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান- এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত।

ইহুদিবাদী আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত ইউরোপের ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিনে গিয়ে বসত গাড়তে শুরু করে। কিন্তু তাদের এই অভিবাসন স্থানীয়সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব এবং মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়লে‘লিগ অব নেশনস’এর পক্ষ থেকে ব্রিটেনকে ‘ম্যান্ডেট’দেয়া হয় ফিলিস্তিন শাসন করার।পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন কার্যত ভাগ-বাটোয়োরা করে নিয়েছিল ব্রিটেন আর ফ্রান্স।ফিলিস্তিনে তখন আরব জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদিবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ ইহুদিকে হত্যা করায় ইহুদিদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় চাপ বাড়তে থাকায় ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলটি তখন ফিলিস্তিনি আর ইহুদীদের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরাইল।কিন্তু পরদিনই মিশর, জর্দান, সিরিয়া এবং ইরাক মিলেব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলে অভিযান চালায়। সেটাই ছিল প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। ইসরাইলিদের কাছে এটি স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।জাতিসংঘ প্যালেস্টাইনে আরবদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে অঞ্চলটি বরাদ্দ করেছিল, এই যুদ্ধের পর তার অর্ধেকটাই চলে যায় ইসরাইলের দখলে।ফিলিস্তিনের জাতীয় বিপর্যয়ের শুরু সেখান থেকে। এটিকেই তারা বলে ‘নাকবা’বা বিপর্যয়। প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু আরব আর ইসরাইলিদের মধ্যে এটা ছিল এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সূচনা মাত্র।

এরপর এলো ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। ইসরাইলএই যুদ্ধে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে ১৯৪৮ সাল হতে মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজা এবং সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয়। অন্যদিকে পূর্ব জেরুসালেমসহ পশ্চিম তীরও তারা দখল করে নেয় জর্দানের কাছ থেকে। সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে গোলান মালভূমি। আরও পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি-ঘর ফেলে পালাতে হয়।

আরব-ইসরাইল সংঘাতের ইতিহাসে এর পরের যুদ্ধটি ‘ইয়োম কিপুর’যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের এই যুদ্ধের একদিকে ছিল মিশর আর সিরিয়া, অন্যপক্ষে ইসরাইল। মিশর এই যুদ্ধে সিনাই অঞ্চলে তাদের কিছু হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করে। তবে গাজা বা গোলান মালভূমি থেকে ইসরাইলকে হটানো যায়নি।

কিন্তু তাই বলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধ শেষ হলো না। গাজা ভূখন্ড যেটি বহু দশক ধরে ইসরাইল দখল করে রেখেছিল, সেটি ১৯৯৪ সালে তারা ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিরিয়ে দিল। সেখানে ইসরাইলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরনের লড়াই হয় ২০০৮, ২০০৯, ২০১২ এবং ২০১৪ সালে।

ফিলিস্তিনিদের রক্তাক্ত ইতিহাসে ১৪ই মে, ২০১৮ ছিল আরেকটি বিষাদময় দিন। যুক্তরাষ্ট্র সেদিন জেরুসালেমে তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করছিল। আর সেদিন গাজা পরিণত হয়েছিল এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের হিসেব অনুযায়ী ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে সেদিন গাজায় নিহত হয় ৫৮ জন। আহত হয় আরও প্রায় তিন হাজার। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর এক দিনে এত বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির ঘটনা আর ঘটেনি।

সম্প্রতি ১১ দিনের বিমান হামলার পর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো গত ২১ মে শুক্রবার। এ যুদ্ধে ইসরাইল আর হামাস উভয়েই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলি পুলিশের অভিযানের জেরে হামাস রকেট ছোড়া শুরু করলে গেল ১০ মে থেকে গাজায় বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। ইসরাইলি বর্বরতায় ২৩২ ফিলিস্তিনি এবং ১২ ইসরাইলি নিহত হন।ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট এতটা বিতর্কিত যে এ ইস্যুতে গোটা দুনিয়ার মানুষ দুই শিবিরে বিভক্ত।কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এর সমাধান কোথায়?ইসরাইলি আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের পাঁচ দশকের ভোগান্তির অবসান সম্ভব কেবলমাত্র একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্মের মধ্য দিয়ে। জননেত্রী শেখ হাসিনা ঠিক সেই প্রস্তাবনাই দিয়েছেন। দেরিতে হলেও শুরু থেকে ইসরাইলকে সমর্থন করে আসা আমেরিকান প্রশাসন সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যার সমাধানের একমাত্র উপায় যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্ম সেটা স্বীকার করেছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা শুধু জাতীয় অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সফল রূপকার নন, তিনি যে সমকালীন অন্যতম একজন বিশ্ব নেতা আবারো তা প্রমাণ করলেন।

মোঃ আশরাফুল ইসলাম
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক
খুলনা মহানগর আওয়ামীলীগ

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর