সামাজিক দূরত্ব মানতে ও মাস্ক ব্যবহারে অনীহা, খুলনায় বাড়ছে করোনা রোগী

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক ব্যবহারের দিকেই জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগ ও চিকিৎসকরা। দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর প্রথম দিকে সাধারণ মানুষ মাস্ক ব্যবহার শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন মহলের সচেতনতায় মাস্কের ব্যবহার বাড়তে থাকে। তবে বর্তমানে খুলনায় করোনার প্রকোপ বাড়লেও মাস্ক ব্যবহারে আগ্রহ নেই অনেকের। প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা শনাক্তের সংখ্যা। প্রতিদিনই খুলনায় করোনা শনাক্তের রেকর্ড ভাঙছে।

সিভিল সার্জন অফিস ও খুমেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গতকাল শনিবার রাতে মহানগরীসহ খুলনা জেলায় ১৪৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। যা খুলনায় সর্বোচ্চ। এর আগে শুক্রবার খুলনায় করোনা শনাক্ত হয় ১৩৩ জনের। এ পর্যন্ত খুলনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৯৪৬ জনের। আর শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে ১১ জন। গতকাল দুপুরে সিভিল সার্জন অফিসের রিপোর্ট অনুযায়ী খুলনায় সুস্থ হয়েছেন ৯৩ জন।

সামাজিক দূরত্ব না মেনে মাস্ক ব্যতীত প্রয়োজন ছাড়াই অনেকে ঘর থেকে বেরিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন তারা। বিশেষ করে তরুণ-যুবকেরা অলিতে-গলিতে আড্ডা দিচ্ছে। আর যারা মাস্ক নিয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেন তাদের অধিকাংশই সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন না। তারা গলায় মাস্ক লাগিয়ে নাক, মুখ খুলে খোশ গল্প করছেন। যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করেছে। সেখানে মাস্ক না লাগিয়েই দেদারছে ঘুরছে অনেক মানুষ। প্রশাসন, চিকিৎসক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিদিন মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালালেও ভ্রুক্ষেপ করছে না অনেকেই। একই সাথে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, ঘরের বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার না করলে অর্থদন্ড দিচ্ছে। অথচ এক শ্রেণীর মানুষ মাস্ক ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছেন।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও গলিতে ঘুরে দেখা গেছে, বিকেল ৫টার পরেও বেশকিছু দোকান-পাট খোলা। এলাকার মোড়ে মোড়ে তরুণদের জটলা। চলছে আড্ডাবাজিও। খোশ-গল্পে, হাসি আর আড্ডায় বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় তাদের। সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখায় করোনা আতঙ্কও বিরাজ করছে এলাকায়।

নগরীর খালিশপুর বঙ্গবাসী মোড়, মানষী বিল্ডিং মোড়, হাউজিং বাজার, চিত্রালী বাজার, আলমনগর, নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়, নিউ মার্কেট এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গতকাল ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করছেন না। আর অনেকেই মাস্ক থাকলেও তারা মুখ ও নাক না ঢেকেই মাস্ক ব্যবহার করছেন।

শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় দেখা যায়, নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়ের ন্যাশনাল ব্যাংকের সামনে কাঁঠালের নিয়ে বসেছে অনেকেই। সেখানে মানুষের ভীড় লক্ষ্য করা যায়। কাঁঠাল ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বিভিন্ন পণ্য ভ্যানে নিয়ে বিক্রি করছেন সেখানে। ক্রেতা সমাগমও অনেক।

অনেকে বলছেন, দীর্ঘক্ষণ মাস্ক ব্যবহারে একটা বিরক্তি ভাব চলে এসেছে। অনেকের নিঃশ্বাস নিতে ও শ্বাস ফেলেতে কষ্ট হয়। অনেকে আবার বাড়ি থেকে মাস্ক নিয়ে বের হতেই ভুলে যান। মোড়ে মোড়ে দলবদ্ধভাবে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। তাদের অনেকের মুখেই নেই মাস্ক। বেশিরভাগ মুদির দোকানের মালিক ও কর্মচারীদের মাস্ক ব্যবহার দেখা যায়নি। ক্রেতাদের মুখেও নেই মাস্ক। মাস্ক ছাড়াই তারা ঘর থেকে বের হচ্ছেন।

খালিশপুরের রাজু নামে ব্যক্তি বলেন, প্রথম দিকে আমরা নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করতাম। এখন আর ভালো লাগে না। মাস্ক ব্যবহার করলে কেমন যেন অসুস্থবোধ লাগে। তবে এটা আমাদের নিজেদের জন্যই ব্যবহার করা উচিত।

হাউজিং বাজার এলাকার ফয়সাল আহমেদ বলেন, মাস্ক ব্যবহার করি। এই মাত্র পকেটে রেখেছি। পুনরায় তিনি মাস্কটি পকেট থেকে বের করে পড়লেন। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব না মেনেই অলিতে গলিতে আড্ডা ও রাস্তায় মাস্ক ছাড়া ঘুরছেন অনেকেই।

খুলনা সিভিল সার্জন ডাঃ সুজাত আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে ঘরের বাহিরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, জনগনের মধ্যে অসচেতনতার কারণে নির্বিঘেœ রাস্তায়, অলিতে গলিতে, মোড়ে মোড়ে ও চায়ের দোকানে আড্ডায় দিন দিন করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সাথে জনগণকে সচেতন হয়ে বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাহিরে বের না হওয়া এবং প্রয়োজনে বের হলেও মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লোভস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

কেএমপির উপ-কমিশনার শেখ মনিরুজ্জামান মিঠু বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব মানতে জনগনের মাঝে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একই সাথে অলিতে-গলিতে অযথা আড্ডা ও জনসমাগম বন্ধ, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে দোকানপাট দোকান বন্ধ করা হচ্ছে কিনা এ বিষয়ে পুলিশের নজরদারী ও টহল অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া পুলিশের সহযোগিতায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা করছেন। তিনি জনগনকে সামাজিক দূরত্ব মেনে অযথা আড্ডা না দেওয়া এবং মাস্ক ব্যবহারের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

এদিকে খুলনা জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেল সূত্রে জানা যায়, খুলনায় মাস্ক পরিধান না করার দায়ে, গণবিজ্ঞপ্তির আদেশ লঙ্ঘন করে মোটসাইকেলে একাধিক ব্যক্তি আরোহনের দায়ে এবং সরকার নির্দেশিত সময়ের পরেও দোকান-পাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার দায়ে গতকাল শনিবার জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়াও কর্তব্যরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা করোনা আক্রান্ত রোগীর বাড়ি লকডাউন করেন। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ ইমরান খান, মোঃ মিজানুর রহমান এবং মোঃ রাশেদুল ইসলাম। মোবাইল কোর্টের অভিযানে সহযোগিতা করেন পুলিশ ও আনসারের সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর