শেখ রাসেল, যার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়

মোঃ আশরাফুল ইসলাম
  • প্রকাশিত : রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে বন্দী থেকেছেন, যা প্রায় এক যুগেরও বেশি সময়। কারাগারের বাইরে থাকা অবস্থায় তিনি যে আর দশজন পিতার মতো তাঁর সন্তানদের সময় দিতে পেরেছিলেন তাও নয়। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- ‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাসু (শেখ হাসিনা) ও কামাল নিচে খেলছিল। হাসু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাসিনাকে বলছে, “হাসু আপা, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।” আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, “আমি তো তোমারও আব্বা।” কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস।’

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পাঁচ সন্তানের প্রত্যকেই এই সহ্য না করতে পারা কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। পিতার সান্নিধ্যের জন্য সন্তানদের এমন হাহাকার একজন পিতার জন্য যে কতোটা কষ্টকর তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে হাজারো ব্যস্ততার পরও বঙ্গবন্ধুর জীবনে যখন কিছুটা স্থিতি এসেছিল, তিনি চাননি তাঁর সবচেয়ে ছোট সন্তানটিও সেই একই কষ্ট সহ্য করুক। আর পিতা হিসেবে তিনি নিজেও নিশ্চয় সন্তানদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য আকুল থাকতেন। তাই একান্ত সময় দিতে না পারলেও ছোট্ট রাসেলকে তিনি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সফরে প্রায়ই সঙ্গে রাখতেন। বিবিসির এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তেমনটাই তিনি বলেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠতম সন্তান শেখ রাসেলের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর, ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে।বঙ্গবন্ধু সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। সেইদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিলো ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড় ফুফু ও মেঝ ফুফু মার সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেঝ ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখবো। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালোচুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিলো রাসেল।‘ তার রাখা হয়েছির‘রাসেল’, কারণ ব্রিটিশ দার্শনিক ও লেখক বার্ট্রাণ্ড রাসেল বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন, কারাগারে যার লেখা তিনি পড়তেন এবং পরে অবসরে বেগম মুজিবের কাছে তাঁর দার্শনিকতা ব্যাখ্যা করতেন। ফলে বেগম মুজিবও বার্ট্রাণ্ড রাসেলের ভক্ত হয়ে ওঠেন।

কেমন ছিল শেখ রাসেল? ‘রাসেল হওয়ার পরে আমরা ভাইবোনেরা খুব খুশি হই। যেন খেলার পুতুল পেলাম হাতে। ও খুব আদরের ছিল আমাদের। একটা ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতো। ওইটুকু একটা মানুষ, খুব স্ট্রং পার্সোনালিটি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তি জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘হাসিনা: অ্যা ডটারস টেল’-এ প্রধানমন্ত্রী এভাবেই তুলে ধরেন ছোট্ট রাসেলকে।ছোট থেকে বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে দেখতে দেখতে বড় হওয়া রাসেল অজান্তেই চাপা স্বভাবের হয়ে উঠেছিল। প্রধানমন্ত্রী সে বিষয়ে বক্তৃতায় বলেন, ‘খুব চাপা স্বভাবের ছিল। সহজে নিজের কিছু বলতো না। তার চোখে যখন পানি, চোখে পানি কেন জানতে চাইলে বলতো, চোখে যেন কী পড়েছে। ওইটুকু ছোট বাচ্চা, নিজের মনের ব্যথাটা পর্যন্ত কীভাবে লুকিয়ে রাখতে হয় শিখেছিল।’

বঙ্গবন্ধু জেলে থাকায় রাসেল মন খারাপ করে থাকত। তাই বেগম মুজিব রাসেলের মন ভালো রাখার জন্য তাকে একটা তিন চাকার সাইকেল কিনে দেন। মায়ের কিনে দেওয়া সাইকেলটা নিয়ে সারাদিন খেলায় মেতে থাকত রাসেল। বাড়ির উঠোনের এ কোণ থেকে ও কোণে সাইকেল চালিয়ে বেড়াত সে। বাসায় একটা ছোটখাটো লাইব্রেরি ছিল। লাইব্রেরির বই থেকে বোনরা তাকে গল্প পড়ে শোনাত।একই গল্প কদিন পর শোনানোর সময় দু-এক লাইন বাদ পড়লে সে ঠিকই ধরে ফেলত। রাসেল মায়ের কাছে দেখে বাড়ির কবুতরগুলোকে খাবার দিত, কিন্তু কবুতরের মাংস খেত না।

শিশু রাসেলের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বাবাকে ছাড়াই। বাবাকে দেখতে না পেয়ে মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে আব্বা বলে সম্বোধন করতো রাসেল। এই চাপা কষ্ট যেমন অনুভব করতো ছোট্ট শিশু রাসেল, ঠিক তেমনি তার বাবা শেখ মুজিবও। যা স্পষ্টত ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনীতেও। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকেই রাজবন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসবে না। এ কারণেই তার মন খারাপ থাকতো। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ‘৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, “আব্বা বাড়ি চলো।” কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, “তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।” ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলে-মেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনো বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।’

শেখ রাসেল ছিল ভীষণ দুরন্ত। তার দুরন্তপনার সঙ্গী ছিল বাই-সাইকেল। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছাড়াই সে সাইকেলে করে স্কুলে যেত। পাড়ার আর দশজন সাধারণ ছেলের মতো। বিখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মুসা স্মৃতি কথায় শেখ রাসেল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘একদিন বিকেল পাঁচটার দিকে শাঁ করে ৩১ নম্বরের অপ্রশস্ত রাস্তা থেকে ৩২ নম্বরে ঢুকেই আমার সামনে একেবারে পপাতধরণিতল। গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল সদ্য শৈশবোত্তীর্ণ ছেলেটি। …অতঃপর সাইকেলে উঠে লেকপাড়ে উধাও হলো শৈশবের শেষ প্রান্তের ছোট্ট ছেলেটি। …বিকেলে লেকের পূর্বপাড়ে এমনি করে চক্কর মারত। মধ্যবর্তী ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পূর্বপ্রান্তের সাদা একটি দালান পর্যন্ত সাইকেলারোহীর দৌড়ানোর সীমানা। …এদিকে ৩২ নম্বরের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন স্নেহময়ী মা, তীক্ষ দৃষ্টি রাখতেন দুষ্টু ছেলেটির সাইকেল-পরিক্রমা যেন সীমাবদ্ধ থাকে।’

বেঁচে থাকলে আজ শেখ রাসেলের বয়স হতো ৫৭ বছর। কী অপরাধে এই নিষ্পাপ শিশুটিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সেই উত্তর কি তার হত্যাকারীরা দিতে পারবে? পারবে না, কারণ পাশবিক কাজের কোনো যুক্তি বা উত্তর থাকে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ১১ বছর বয়সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অন্যান্য সসদ্যদের সঙ্গে ঘাতকদের হাতে হত্যার নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় রাসেল। পৃথিবীতে যুগে যুগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কিন্তু এমন নির্মম, নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কোথাও ঘটেনি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রাসেলকে নিয়ে পালানোর সময় ব্যক্তিগত কর্মচারীসহ তাকে আটক করা হয়। আতঙ্কিত হয়ে শিশু রাসেল কেঁদে কেঁদে বলেছিল, ‘আমি মায়ের কাছে যাব’। পরবর্তী সময়ে মায়ের লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিলেন ‘আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন’। মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ওই ছোট্ট বুকটা কি তখন ব্যথায় কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে ওর মনের কী অবস্থা হয়েছিল- কী কষ্টই না ও পেয়েছিল!‘কেন কেন কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল? আমি কি কোনোদিন এই ‘কেন’র উত্তর পাব?’ বঙ্গবন্ধুকন্যার এই আকুতি ভরা কেন’র জবাব কে দেবে?

রাসেল স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবের ছেলে এটাই হয়তো ছিল তার একমাত্র এবং সবচেয়ে বড় অপরাধ। এ প্রসঙ্গে শিশু রাসেল-কে নিয়ে লেখা দুই বাংলার বিখ্যাত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিশুরক্ত’ কবিতাটি খুব মনে পড়ছে-

‘তুইতো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে
সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়সেতে ছিলি!
তবুও পৃথিবী আজ এমন পিশাচি হলো
শিশুরক্তপানে তার গ্লানি নেই?
সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে!
যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায়
আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই।’

মোঃ আশরাফুল ইসলাম
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক
খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর