পেটের যেসব ব্যথা অ্যাপেন্ডিসাইটিসের

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পেটের নিচে ডান দিকে পাকস্থলীর একটি অংশে রয়েছে সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা নলাকার অঙ্গটি, যা অ্যাপেন্ডিক্স বলে পরিচিত। শরীরের এই অঙ্গটি একেবারেই অকেজো। এর কাজ সম্পর্কে এখনও পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি। অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা বা অ্যাপেন্ডিসাইটিস মূলত অ্যাপেন্ডিক্সের সংক্রমণ বা সমস্যা থেকে হয়। এটিকে অকেজো অঙ্গ বলা হয়। কিন্তু এই ছোট্ট থলেতে আকস্মিক প্রদাহ হলে দেখা দেয় অসহনীয় ব্যথা।

অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরে প্রতিবন্ধকতার ফলে ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি হয়ে অ্যাপেন্ডিক্স ফুলে ওঠে এবং এতে পুঁজ জমতে শুরু করে। অ্যাপেন্ডিক্সের এই সমস্যাটি অ্যাপেন্ডিসাইটিস নামে পরিচিত। যথা সময়ে অস্ত্রোপচার না করালে বা সময় মতো সমস্যা ধরা না পড়লে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষের প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই অঙ্গটি।

অ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্তের কোন নির্দিষ্ট বয়স নেই। যেকোনও বয়সেই অ্যাপেন্ডিসাইটিস হতে পারে। তবে ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে যাদের বয়স, তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যাপেন্ডিসাইটিস জন্ম বা বংশগত কারণেও হয়ে থাকে। পরিবারে পূর্বে কারো এই রোগটি হয়ে থাকলে তবে শিশুদের এই রোগটি হতে পারে।

অ্যাপেন্ডিসাইটিস সারা বছরই হতে পারে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শীতকালে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মে মাসের মধ্যেই হয়ে থাকে। পুরুষদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা মহিলাদের তূলনায় কিছুটা বেশি।

ফাইবার জাতীয় খাবার কম খেলে এবং রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ বেশি খেলে অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে, সিস্টিক ফাইব্রোসিসে ভুগছে এরকম শিশুদের অ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যাপেন্ডিক্সকে সার্জিক্যাল ইমার্জেন্সি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তাই অ্যাপেনডিসাইটিসের সমস্যা কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। কোনও কারণে অ্যাপেন্ডিক্সে খাদ্যকণা বা ময়লা ঢুকে গেলে সেখানে রক্ত আর পুষ্টির অভাব দেখা দেয়। শুধু তাই নয় সেখানে নানা রকম জীবাণুর আক্রমণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অ্যাপেনডিক্সে ব্যথা হতে শুরু করে।

মনে রাখতে হবে অ্যাপেন্ডিক্স কোনও কারণে ফেটে গেলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই অ্যাপেনডিসাইটিসের উপসর্গগুলো চিনে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া জরুরি।

উপসর্গ ও লক্ষণসমূহ

পেটে ব্যথা হয়। সাধারণত, নাভির কাছ থেকে শুরু হয়ে পেটের ডান দিকের নিচের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে,

ক্ষুধামন্দা বা খিদে না পাওয়া,

বমি বমি ভাব,

বমি হওয়া,

ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যাওয়া,

জ্বর জ্বর ভাব। তবে এ ক্ষেত্রে শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি হয় না,

অ্যাপেন্ডিক্স কোনও কারণে ফেটে গেলে সারা পেট জুড়ে মারাত্মক ব্যথা অনুভূত হয় এবং পেট ফুলে ওঠে।

অ্যাপেন্ডিসাইটিসের চিকিৎসা

অ্যাপেন্ডিসাইটিসের চিকিৎসা হলো আক্রান্ত অংশ বা অ্যাপেন্ডিক্স যত দ্রুত সম্ভব অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কেটে ফেলে দেওয়া। অস্ত্রোপচারের ভয়ে অনেকে হাসপাতালে যেতে চান না। অনেক সময় শিশু বা বেশি বয়স্করা ব্যথার সঠিক বর্ণনাও দিতে পারে না। কিন্তু জটিলতা এড়াতে পেটে ব্যথা তীব্র ও স্থায়ী অথবা থেকে থেকে হলে রোগীকে শক্ত খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন বা মুখে খাবার দেওয়া বন্ধ রাখুন এবং দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।

অ্যাপেন্ডিসাইটিস নির্ণয়ে পরীক্ষা

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগী দেখে এবং তার অভিজ্ঞতা থেকে অনেক সময় কোন পরীক্ষা না করিয়েও রোগীর অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে কিনা তা কিছুটা নিশ্চিত করতে পারেন। যেমন- যদি রোগীর কাশতে গেলে পেটে তীব্র ব্যথা অনুভুত হয়। আবার যদি তলপেটের বামদিকে চাপ দিলে ডানদিকের তলপেটে তীব্র ব্যথা অনুভুত হয় অথবা তলপেটের ডানদিকে চাপ দিলে বামদিকের তলপেটে তীব্র ব্যথা অনুভুত হয়, তাহলে সেটা অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা হতে পারে। আবার পেটের ডান দিকের নিচের অংশে নানান কারনে ব্যথা হতে পারে, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। তাই, অপারেশনের পূর্বে চিকিৎসককে নানান বিষয় যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে এটা এ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা কিনা। আলট্রাসনোগ্রাম বা রক্ত পরীক্ষা অ্যাপেনডিসাইটিস নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে।

অপারেশন পরবর্তী সতর্কতা

ল্যাপ্রোস্কোপির মাধ্যমে অপারেশন করা হলে, কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। অপরদিকে যদি ওপেন অ্যাপেনডেকটোমি করা হয়, তাহলে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৪ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। অপারেশন পরবর্তী সম্পূর্ণ সুস্থ্য হতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে।

ঘুম বোধ হলে বা ক্লান্ত লাগলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে। কাশি, হাসি অথবা নড়াচড়া করার পূর্বে তলপেটের উপর একটি বালিশ রেখে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এটি ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে। পেইনকিলার খাওয়া সত্ত্বেও ব্যাথা না কমলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

অপারেশন পরবর্তী ঝুকি কমাতে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশ্রাম করতে হবে। শিশুরা অপারেশনের এক সপ্তাহ পরে স্কুলে যাওয়া শুরু করতে পারবে তবে শ্রমসাধ্য কাজ যেমন জিম বা খেলাধুলা পুনরায় শুরু করার পূর্বে কমপক্ষে ২ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় নেয়া উচিত। নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে হবে।

সাধারণত ফাইবার জাতীয় খাবার কম খেলে অ্যাপেন্ডিসাইটিস হবার সম্ভাবনা বেশি। সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন পেতে সব সময় প্রাকৃতিক ভেষজ যেমন মেথি, বাদাম তেল, জিনসেং,, সবজির জুস, পুদিনা পাতার জুস খাওয়া দরকার। প্রাকৃতিকভাবে এসব খাবার অ্যাপেন্ডিসাইটিস প্রতিরোধে সহযোগিতা করে।

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর