দেশে কোটির বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

ডায়াবেটিস একটি মহামারী রোগ। বাংলাদেশে ১ কোটির বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে অন্য দেশের তুলনায় কম বয়সীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার বেড়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকটাই উদ্বিগ্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে পারলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। উপযুক্ত খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন, নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, ব্লাডের গ্লুকোজ পরীক্ষা, রক্তচাপ পরীক্ষা, দৃষ্টিশক্তির পরির্বতন সম্পর্কিত চেকআপ ইত্যাদির মাধ্যমে ডায়াবেটিসজনিত সমস্যা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে এবং যাদের এখনও ডায়াবেটিস হয়নি তাদের এ রোগ প্রতিরোধে সচেতন করতে ‘প্রিভেনশন পলিসি অ্যান্ড কন্ট্রোল ফর ডায়াবেটিস’ প্রণয়ন জরুরি। কিন্তু দেশে রোগটি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে জাতীয়ভাবে কোনো নীতিমালা নেই। গত ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে নীতিমালা প্রণয়নের কথা শোনা গেলেও এখনও সেটি হয়নি। নীতিমালাটি প্রণয়নের দায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় নাকি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের, তা নিয়ে রশি টানাটানিতে আজও ঝুলে আছে নীতিমালাটি।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ পালন করা হয়। আজ শনিবার বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘ডায়াবেটিস-সেবায় পার্থক্য আনতে পারেন নার্সরাই’ ডায়াবেটিস প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ১৭০টি দেশে দিবসটি পালিত হবে। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে র‌্যালি, বিভিন্ন স্থানে বিন্যামূল্যে লাখো মানুষের ডায়াবেটিস পরীক্ষা, আলোচনাসভা, রচনা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর অর্ধেকই নারী। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে একশজনের মধ্যে ২০ জনই গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। যাদের অর্ধেকের বেশি পরবর্তীকালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। যেসব মায়ের গার্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকে তাদের শিশুদেরও পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশ্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) সভাপতি অধ্যাপক একে আজাদ খান বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ১০০ জনের মধ্যে ২০ জন মহিলাই গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। যাদের ৬৫ শতাংশই পরবর্তীকালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রাস্ত মহিলাদের ও গর্ভস্থ শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পরিকল্পিত গর্ভধারণ ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। ফলে যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহাজাদা সেলিম ডায়াবেটিস নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেছেন, ডায়াবেটিস রোগীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। ধারণা করা যায় দেশে ১ কোটির বেশি ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে। ডায়াবেটিস রোগী গ্রামের তুলনায় শহরে বেশি। তবে এখন ডায়াবেটিস রোগী শহর আর গ্রামের মধ্যে তফাত কমে আসছে।

ডা. শাহাজাদা সেলিম বলেন, বাংলাদেশের জন্য বেশি ঝুঁকি হচ্ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিক রোগী। সাধারণত বেশি বয়সী মানুষ ডায়াবেটিস টাইপ-২ আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিশ্বের কোনো কোনো দেশ বলছে তাদের দেশে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হচ্ছে ৪০ বছরের পর, কোনো কোনো দেশে ৪৫ বছরের পর হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে অন্য দেশের তুলনায় কম বয়সীদের মধ্যে এ রোগ দেখা যাচ্ছে। ভারতের এক গবেষণায় দেখা গেছে সে দেশে যাদের বয়স ১৫ বছরের কম তাদের মধ্যে এ রোগী ১৬ শতাংশ। বাংলাদেশের অবস্থাটাও অনেকটা এ রকমই হবে। এটি কিন্তু চরম আতঙ্কের বিষয়। একজন ৭০ বছর বয়সী মানুষের ডায়াবেটিস ধরা পড়লে তিনি এ রোগ নিয়ে আরও ১০-১৫ বছর ভালোভাবে বাঁচতে পারেন। কারও যদি ৭ বছর, ১০ বছর বা ১২ বছর বয়সে ধরা পড়ে তা হলে এই বয়সী মানুষের ৮০-৯০ বছর বেঁচে থাকা অসম্ভব। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও শারীরিক শ্রম খুবই জরুরি, যেটি এত কম বয়সীদের দ্বারা করানো সম্ভব হবে নয়। আর সম্ভব না হলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এতে করে কিডনি নষ্ট হবে, চোখ নষ্ট হবে, হার্ট অ্যাটাক হবে, সব ঝুঁকি সামনে এগিয়ে আসবে।

ডা. শাহাজাদা সেলিম বলেন, একজন ৪০ বছর বয়সী মানুষের ডায়াবেটিস ধরা পড়লে তিনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও তার যত বছর বাঁচার কথা তার থেকে ১০ বছর কম বাঁচবেন, নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে আরও ১০ বছর কম বাঁচবেন। এ জন্য সামগ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। যেখানে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে, খাদ্যব্যবস্থা ঠিক করতে হবে, শারীরিক শ্রমের ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে। এ ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান ঠিক করতে হবে। আমাদের দেশে এ ব্যবস্থা গড়ে ওঠনি।

ডা. শাহাজাদা সেলিম বলেন, ডায়াবেটিস রোগ হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে শর্করাজাতীয় খাবার। আমাদের দেশের মানুষের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ খাবার হচ্ছে শর্করা। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার নেই। এখানে সামগ্রিকভাবে হাত দিতে হবে।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট) ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের ‘বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৭-১৮ চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে প্রকাশ করে। জরিপে বলা হয়েছে, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ১০ জনে ১ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আর প্রতি ৪ জনে একজন উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত। দুটি রোগী শহর এলাকায় এবং উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে বেশি। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান।

নিপোর্টের সঙ্গে জরিপে যুক্ত ছিল আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিএফ ইন্টারন্যাশনাল নামের মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। জরিপে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি। জরিপ হয়েছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত।

জরিপ বলছে, বর্তমানে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ ১ কোটি ১০ লাখ। ১৮-৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এ সংখ্যা ২৬ লাখ। আর ৩৫ বছর ও তার চেয়ে বেশি বয়সীদের মধ্যে ৮৪ লাখ। ডায়াবেটিস পরিস্থিতি জানার জন্য ৬ হাজার ৯৯৭ জন নারী এবং ৫ হাজার ২৯৯ জন পুরুষের রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা হয়েছিল।

জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ নারী ও পুরুষ জানেই না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। মাত্র ১৩ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগী তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন। তারা নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে। ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানেন এবং চিকিৎসাও নিচ্ছেন, অথচ ২২ শতাংশের বেশি নারী-পুরুষের তা নিয়ন্ত্রণে নেই।

তবে পরিস্থিতির যে অবনতি হচ্ছে, সে তথ্যও জরিপে উঠে এসেছে। ২০১১ সালে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের ১১ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। এখন সেই হার ১৪ শতাংশ। পুরুষের মধ্যেও একইভাবে ডায়াবেটিস বেড়েছে।

প্রাথমিক ফলে দেখা গেছে, অপুষ্টির শিকার নারী-পুরুষের মধ্যে ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে। আবার বেশি বয়স্কদের মধ্যে উচ্চরক্তচাপের প্রকোপ বেশি। উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং এদের সারা জীবন চিকিৎসা দরকার।

দেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধি। দেশে মোট মৃত্যুর ৬০ শতাংশের বেশি হচ্ছে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, ক্যানসার, কিডনি ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের মতো অসংক্রামক রোগে।

অন্যদিকে গেল বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতাল মিলনায়তনে ‘ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়। দেশে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। প্রতি বছর নতুন করে ৫ লাখ ডায়াবেটিক রোগী নিবন্ধিত হচ্ছেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ৫০ শতাংশ রোগীই জানেন না, তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের এন্ডোক্রাইননোলজি অ্যান্ড ডায়াবেটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। বাংলাদেশে ৭৩ লাখ ৫০ হাজার ডায়াবেটিস রোগী রয়েছেন। দেশের ৪৫ লাখের বেশি নিবন্ধিত ডায়াবেটিক রোগী রয়েছেন। ডায়াবেটিক রোগীদের শতকরা ৫০ ভাগই জানে না তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিস চিকিৎসাব্যবস্থার অনেক উন্নতি ঘটলেও অনেক তথ্য না জানার কারণে সঠিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ সবার ডায়াবেটিস এক ধরনের নয়। সব রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি এক রকম নয়। রোগের সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় রোগীর তথ্য জানা। রোগীর তথ্য জানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে নিবন্ধন করা খুবই জরুরি।

তিনি বলেন, বর্তমানে ডায়াবেটিস সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সমিতির ডায়াবেটিক কেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ডায়াবেটিস সমিতির তত্ত্বাবধানে ডায়াবেটিস কেন্দ্রগুলোতে বছরে ৫ লাখ নতুন রোগী নিবন্ধন নিচ্ছেন। তবে এ নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলছে পুরনো পদ্ধতিতে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশে ৭৩ লাখ ৫০ হাজার ডায়াবেটিক রোগী কথা বলা হলেও এটি প্রকৃত সংখ্যা নয়। কারণ ডায়াবেটিক রোগী নিয়ে পুরোপুরি কোনো জরিপ নেই। আমরা ব্যাপক আকারে সার্ভে করেছি, তাতে এ সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কথা। কোনো কোনো জেলায় ১০ শতাংশের বেশি ডায়াবেটিক রোগী রয়েছে। ১০ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে দেশে ১ কোটি ৬০ লাখ রোগী হতে পারে। আমাদের একটি জরিপ কার্যক্রম চলছে। আগামী ৩ বছর পর জরিপের ফল পাওয়া যাবে। তখনই জানা যাবে দেশের ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা কত।

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর