জাপানের চ্যাম্পিয়ন শিনজো আবে

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : শনিবার, ৯ জুলাই, ২০২২

জাপানের ইতিহাসের পাতায় আগেই জায়গা করে নিয়েছিলেন শিনজো আবে। ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধোত্তর অন্য যেকোনো নেতার চেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ৮ জুলাই নির্বাচনী প্রচারণার অনুষ্ঠানে ঘাতকের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭ বছর বয়সী শিনজো আবে। যুদ্ধোত্তর যুগে নিহত হওয়া প্রথম জাপানি সরকার প্রধান তিনি।

আধুনিক জাপানের সবচেয়ে পরিণত রাজনীতিবিদদের একজনের এভাবে মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি।

ছোটবেলায় তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তার রাজনীতিতে যাওয়ার পথটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। শিনজো আবে একজন রাষ্ট্রনায়কের পরিবারের সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন আবে শিনতারোর পুত্র, যিনি একজন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কিশি নোবুসুকের নাতি যিনি একজন সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধী ছিলেন। পরে ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কিশি। আবে তাদের অসমাপ্ত কাজটি সম্পূর্ণ করাকে তার রাজনৈতিক মিশন হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। বিশ্বব্যাপী ক্ষমতা-রাজনীতিতে জাপানের স্থান পুনরুদ্ধার করা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর আমেরিকান দখলদারদের চাপে তার দেশ গৃহীত কিছু শান্তিবাদী নীতি ভেঙে ফেলা।

সমালোচকদের কাছে, তিনি জাতীয়তাবাদী সংশোধনবাদের একটি বিপজ্জনক স্ট্রেনের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সমর্থকদের কাছে, তিনি ছিলেন বাস্তববাদী স্বপ্নদর্শী। যেখানে জাপানকে আরও শক্ত অবস্থানে আধুনিক বিশ্বে প্রয়োজন।

২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবের প্রথম মেয়াদ আর্থিক কেলেঙ্কারি ও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে শেষ হয়েছিল। শিনজো আবে ২০১২ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও ফুকুশিমায় ত্রৈমাত্রিক বিপর্যয়ে (ভূমিকম্প, সুনামি ও পারমাণবিক দ্রবণ) বিপর্যস্ত একটি দেশে। সে সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘জাপান দ্বিতীয় স্তরের নয়, এবং হবেও না। তিনি তার ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক এজেন্ডা ‘অ্যাবেনোমিক্স’ নিয়ে দ্বিতীয়বার ফিরে আসেন।

তার তিন তীর বিশিষ্ট নীতি হলো শিথিল আর্থিক নীতি, সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি এবং কাঠামোগত সংস্কার। জাপানকে তার দীর্ঘ মুদ্রাস্ফীতিমূলক মন্দা থেকে বের করে আনতে সাহায্য করেছিল এবং স্টকমার্কেটকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও অর্থনীতিতে তার সরকার নির্ধারিত মুদ্রাস্ফীতি বা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি। বলা যায়, আবে ভূ-রাজনীতিতে একটি ছাপ রেখে গেছেন, ফলে দেখা যাচ্ছে যে তার মৃত্যুর খবরের পর বিশ্ব নেতাদের কাছ থেকে তাকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে কূটনীতিকরা এখন ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ এর পরিপ্রেক্ষিতে এশিয়ার কথা বলছেন, যেটি আবে শুরু করেছিলেন। আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ‘চতুর্ভুজ’ গ্রুপ ‘কোয়াড’ ছিল তার আরেকটি ধারণা। ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ, একটি বড় এশীয় বাণিজ্য চুক্তিতেও তার অবদান রয়েছে। দ্য লোই ইনস্টিটিউট, অস্ট্রেলিয়ার একটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক, জাপানকে এশিয়ার ‘উদারনীতির নেতা’ বলে অভিহিত করেছে।

তবুও আবে মেরুকরণে রয়ে গেছেন কারণ তিনি নির্বাচনের পর নির্বাচনে জিতেছেন। জাপানের নিরাপত্তা আইনে তার পরিবর্তন বড় প্রতিবাদের সূত্রপাত করে। তার ঐতিহাসিক অস্বীকৃতি সাবেক উপনিবেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক মেরামত করা কঠিন করে তুলেছে। বিতর্কিত অঞ্চল নিয়ে পুরোনো বিরোধ নিরসনের প্রচেষ্টায় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও তার টেকসই সৌজন্যতা দেখা যায়নি। যদিও দুর্নীতির কেলেঙ্কারি তার প্রশাসনের খ্যাতি নষ্ট করেছে।

আবের শাসনামলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে জাপানের র্যাঙ্কিং কমে গেছে। কিন্তু যদিও ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পদত্যাগ করার সময় তার সরকারের অনুমোদনের রেটিং কমে গিয়েছিল। পরবর্তী জরিপে দেখা গেছে যে ৭৪ শতাংশ জাপানি তার শাসনকে অনুমোদন করেছে।

শিনজো আবে ক্ষমতা ছাড়ার পর জাপানের রাজনীতিতে একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়ে গেছেন। তিনি কিয়োটোর দক্ষিণে একটি প্রাচীন রাজধানী নারা শহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

শিনজো আবেকে হত্যাকাণ্ড জাপানকে হতবাক করেছে, যেখানে বন্দুক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং রাজনৈতিক সহিংসতা অত্যন্ত বিরল। ২০২১ সালে মাত্র একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান দেশটিতে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর