জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে নস্যাতের প্রচেষ্টা

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২ নভেম্বর, ২০২১

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম একটি কালো অধ্যায় ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দি চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ড। মূলত যে কারণে ও উদ্দেশ্যে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনককে হত্যা করা হয়, তারই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধুর চার প্রধান সহযোগীকে হত্যা করা হয়। ৩ নভেম্বর নিহত তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদমনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান ছিলেন মুজিবনগর সরকারের চার প্রধান স্তম্ভ, যে সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিলএবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর চার প্রধান সহযোগীর হত্যার মূল কারণ ছিল বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংবিধানকে পাকিস্তানিকরণের চক্রান্তের অংশ।

’৭১-এ পরাজয়েরযারা গ্লানি ভুলতে পারেনি, বাংলাদেশে পাকিস্তানি চেতনার সেই ধারকরাই হত্যা করেছে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর চার প্রধান সহযোগীকে। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা- ‘ধর্মনিরপেক্ষতা,’ ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ মুছে ফেলে পাকিস্তানি ভাবধারায় নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করা। জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তার উত্তরসূরী জেনারেল এরশাদ সংবিধানের ৫ম ও ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়ে একুশ বছর ধরে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া জারি রেখেছিলেন। ’৭১-এর পরে যারা জন্মেছে তাদের গড়ে তোলা হয়েছে পাকিস্তানি ভাবধারায়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের অধিকাংশ সদস্য জানত না ’৭১-এ কার বিরুদ্ধে কেনো যুদ্ধ হয়েছিল, কারা ছিল শত্রু ও মিত্র। বাংলাদেশে পাকিস্তানি চেতনার ধারকরা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চিহ্নিত শত্রুরা এ-কাজ কখনো করতে পারতো না, যদি না তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদমনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানদের হত্যা করতো।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায় বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকারীদের বিচার না করার ইনডেমনিটি আইন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দ্বারা রাষ্ট্রপ্রধানের নিহত হওয়ার নজির আরও আছে কিন্তু একই সঙ্গে সপরিবারে হত্যা, সন্তানসম্ভবা বধূ ও শিশু হত্যার বর্বরতম নজির পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। একইভাবে কারারুদ্ধ জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সাড়ে তিন বছর আগে যাঁদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল বাঙালির ইতিহাসের মহত্তম অর্জন ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, তাঁদের ঠাণ্ডা মাথায় মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করারও দ্বিতীয় কোন নজির নেই। তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল বিনা অভিযোগে, হত্যা করা হয়েছিল বিনা বিচারে কারারুদ্ধ অবস্থায়। এই হত্যাকাণ্ড সভ্য সমাজকে বিচলিত ও ক্ষুব্ধ করলেও জেনারেল জিয়া হত্যাকারীদের নিজের দলে ঠাঁই দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করেছেন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে। এইভাবে বাংলাদেশে হত্যার রাজনীতি বৈধতা পেয়েছে, যার পরবর্তী শিকার হয়েছিলেন স্বয়ং জিয়াউর রহমান।

৩ নভেম্বর জেলহত্যা সংঘটিত হয়েছিল বাঙালির চেতনা থেকে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও মানবিকতা মুছে ফেলার জন্য। ধর্মের নামে জাতিকে বিভক্ত করা কোনো সভ্য সমাজ অনুমোদন করে না। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে অমানবিকতা ও বর্বরতার দিকে ধাবিত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চার মহান নায়ককে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকারী ও তাদের সহযোগীরা জানতো এই নেতারা বেঁচে থাকলে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাবার নীলনকশা বাস্তবায়ন করা যাবে না। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্যেও জরুরি ছিল এই হত্যাকাণ্ড, কারণ আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ভেঙেছে। এদের অবর্তমানে আওয়ামী লীগকে একুশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। এই একুশ বছরে গোটা এক প্রজন্মকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু ও তাঁর চার প্রধান সহযোগীকে হত্যা না করে বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি করা যেতো না, জেনারেল জিয়া কিংবা জেনারেল এরশাদ কখনো ক্ষমতায় আসতে পারতেন না, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তারা উর্দিপরা জেনারেলদের বুটের তলায় পিষ্ট করতে পারতেন না।

একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘাতকদের বিচার করবে এটা বিএনপির পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন ছিল। থলের বেড়াল বেরুবে বলে বিএনপি যেমন দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে চায়নি, একইভাবে তারা চায়নি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোগীদের হত্যার বিচার হোক। জিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে যে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তাদের বিচার হয়েছে সামরিক বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার জন্য নয়। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যার বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য সম্পন্ন করলেও পর্দার অন্তরালে থেকে যারা হত্যার প্ররোচনা দিয়েছে, হত্যার নীলনকশা তৈরি করেছে এবং হত্যার সুযোগে রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে তারা অন্তরালেই থেকে গেছে। তাদের ভয় ছিল জেল হত্যার বিচার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকলে বিএনপির অনেক রাঘব বোয়াল ধরা পড়ে যাবেন। বঙ্গবন্ধু ও চার নেতাকে যারা হত্যা করেছে তারা পরবর্তীকালে নিজেরা যেমন রাজনৈতিক দল করেছে, একইভাবে তাদের অনেকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় বিএনপিতেও যোগ দিয়েছে। পরবর্তীকালে বিএনপি তাদের মনোনয়ন দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী করেও এনেছে।

৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ঘটেছে ৭ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অধিনায়ক খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীদের হত্যাকাণ্ড এবং জিয়াউর রহমানের মসনদে আরোহন। জিয়াকে যারা মসনদে বসিয়েছিলেন তাঁদের নায়ক ছিলেন তাঁরই সহযোগী মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধিনায়ক কর্নেল তাহের। ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্য জিয়া তাঁর সহযোগী ও সুহৃদ তাহেরকেও হত্যা করতে কুণ্ঠিত হননি। শুধু তাহের নয়, বাংলাদেশকে পাকিস্তানে রূপান্তরিতকরণ প্রক্রিয়ায় জেনারেল জিয়ার আমলে প্রায় দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে জিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাওয়ার অভিযোগে।

যৌক্তিক কারণেই বিএনপির পক্ষে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেমন সম্ভব ছিল না, জেল হত্যার বিচারও সম্ভব ছিল না। খুনিরা কখনো নিজেদের বিচার করে না। বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে জামায়াতে ইসলামী, যাদের দর্শন হচ্ছে ৩ নভেম্বরের ঘাতকদের মূল প্রেরণা। জামায়াতের মতো সহযোগীদের এবং দলের কতিপয় নেতাকে সন্তুষ্ট ও রক্ষা করার জন্যে বিএনপি জেলহত্যা মামলা হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এক সময়ের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ক্ষমতায় থাকতে জেলহত্যা মামলার বিচারে স্থাবিরতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন- ‘কত লক্ষ মামলা বিভিন্ন আদালতে ঝুলে আছে’। কয়েক লক্ষ মামলার সঙ্গে একটি মামলা যুক্ত হলে বিএনপি হয়তো ভাবতে পারে এতে কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। কিন্তু বাংলাদেশের অস্তিত্ব যতদিন টিকে থাকবে, স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে ’৭১ ও ’৭৫-এর কোন ঘাতকই রেহাই পাবে না, যতই তারা বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধুক। বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার উত্তরাধিকারীরা আজও বেঁচে আছেন। যতদিন তাঁরা বেঁচে থাকবেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম যতদিন বেঁচে থাকবে ’৭১ ও ’৭৫-এর ঘাতকরা বিচার ও শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাবে না।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোগীদের হত্যা করে ইতিহাসের চাকা সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়া গেছে, কিছুটা পেছনেও ঠেলে দেয়া হয়েছে কিন্তু মহাকালের গতিরোধ করবে এমন সাধ্য কারও নেই। কালের অমোঘ নিয়মে বাঙালির ইতিহাসের চাকা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে। ’৭১-এর ঘাতকদের বিচারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ ‘অপরাধ থেকে দায়মুক্তি’র অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় আমরা আশা করতে পারি আগামীতে ’৭৫-এর ৩রা নভেম্বরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়কদেরও বিচার ও শাস্তি এই বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

মোঃ আশরাফুল ইসলাম
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক
খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ।

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর