করোনাকালের বিক্ষিপ্ত ভাবনা: ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : সোমবার, ২৮ জুন, ২০২১

২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনে এবং পরের বছরের শুরুতে সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের দাপটে সারা পৃথিবী হঠাৎ এবং অভাবিতভাবে লকডাউন নামের যে স্থবিরতার মধ্যে পড়লো, ইতিহাসে তা নজিরবিহীন না হলেও,সাম্প্রতিক কয়েক প্রজন্মের মানুষের কাছে এটা একটা অভিনবঅভিজ্ঞতা। বিভিন্ন সময় সুনামি, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতি দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি মানব সৃষ্ট দুর্যোগ দেখা দিলেও সেগুলির প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল অঞ্চল ভিত্তিক। সেগুলির কোনোটাই এক সাথে সারা বিশ্বের মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। ব্যাপকতার বিবেচনায় করোনা মহামারি যেন ৩য় বিশ্বযুদ্ধ। কারণ, ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনো ঘটনা এমন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, অন্তত এতো দীর্ঘ সময় ধরে তো নয়ই। দেড় বছর হতে চললো এক অদৃশ্য শত্রুর সাথে আমরা লড়াই করে চলছি। যুদ্ধ পরিস্থিতির মতোই দেশে দেশে হাসপাতালগুলোতে রক্তের চাহিদার মতো অক্সিজেনের চাহিদা তীব্র হয়ে উঠেছে।

শত্রু অদৃশ্য বলেই এ এক অন্যরকম লড়াই। মহামারির শুরুর প্রথম থেকেই সরকারকে একা তিনটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়েছে, যা এখনো চলমান: করোনার বিস্তার রোধ ও চিকিৎসার লড়াই, জীবন ও জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত এবং অসচেতন মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোসহ লকডাউন কার্যকর করার লড়াই এবং লকডাউনের কারণে জীবিকা হারানো বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ভরণ-পোষণের লড়াই। উন্নত রাষ্ট্র যেখানে জনগণ সচেতন এবং উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রে লকডাউন কার্যকর যতোটা সহজ, আমাদের মতো গণতান্ত্রিকরাষ্ট্রে কাজটা তেমন সহজ নয়। এখানে লোকে যতোটা সহজে গুজবে বিশ্বাস করে, কে জানে কেনো, প্রকাশ্য চেষ্টা করেও ততোটা সহজে তাদের দিয়ে দরকারি কাজটা করানো যায় না। সরকারের কাছ থেকে তারা কোনো উপদেশ, নির্দেশনা বা সতর্কবাণী শুনতে রাজি নয়। কী করলে বা না করলে বিপদ থেকে, রোগ-মহামারি থেকে বাঁচা যাবে এটা বলা যেন সরকারের দায়িত্ব নয়, সরকারের দায়িত্ব কেবল অসুস্থ্ হলে চিকিৎসা সেবা দেওয়া। তাই সেনা বাহিনী এবং পুলিশ দিয়েও জনগণকে লকডাউন মানানো কঠিন হয়ে পড়ে।

কিন্তু এই অভূতপূর্ব যুদ্ধে অর্থনীতি, সামাজিক জীবন, শিক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি থমকে গেলেও রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, দুর্নীতি থেমে থাকেনি। এই করোনা মহামারির মধ্যে মানুষের জীবন-জীবিকা যখন থমকে আছে, সরকার লকডাউনসহ নানা পন্থায় মহামারি দমনে এবং খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত, তখন সব ধরনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং সতর্কতা অমান্য করে বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্তে হেফাজতে ইসলাম রাজনীতির মাঠ গরম করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। অন্যের স্ত্রী নিয়ে রিসোর্টে সময় কাটানোসহ নানা অপরাধে গ্রেফতার মামুনুল হক আজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙ্গেন তো কাল সরকার ফেলে দেন। পরে জানা গেল তারা ক্ষমতায় যেয়ে কে কোন মন্ত্রণালয়ে বসবেন সে ভাগ-ভাটোয়ারাও তারা করে রেখেছিলেন। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। সরকার যখন ব্যস্ত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদিকে অভ্যর্থনা জানাতে, তখন তাঁর সফরের বিরোধিতার নামে ঢাকাসহ কয়েক জেলায় নজিরবিহীন সন্ত্রাস এবং ভাংচুর উস্কে দিয়ে মামুনুল হক নিজে গেলেন অন্যের স্ত্রী নিয়ে রিসোর্টে অবসর সময় কাটাতে। জাতি অবাক হয়ে দেখলো একজন আলেম হয়েও কতো বড় মিথ্যা তিনি বলতে পারেন, কতো বেশরিয়তি কাজ করতে পারেন।

দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা পেয়েছে জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে। কওমী সনদকে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছেন। অনেকেই বলে থাকেন, আওয়ামীলীগ হেফাজতিদের জন্য যতো কিছুই করুক না কেনো, তাদের ভোট কখনো নৌকায় পড়বে না। হয়তো তারা ঠিকই বলেন। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা ভোটের জন্য নয়, ইসলামের সেবার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। ৫৬০ টি উপজেলায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ দৃষ্টিনন্দন মডেল মসজিদ নির্মাণই তার প্রমাণ। জননেত্রী শেখ হাসিনা ঠিক একই কারণে সত্যিকারের আলেম-উলামাদের সব সময় তাদের প্রাপ্য সম্মান দিয়ে এসেছেন। ঠিক একই কারণে মুখে ইসলামের কথা বললেও যাদের কর্মে এবং জীবন যাপনে ধর্ম

ও রাষ্ট্র বিরোধিতা, যারা ধর্মীয় সমাবেশ ও ওয়াজ মাহফিলের নামে কুরআন-হাদিস বিকৃত করে, অশ্লীলতা চর্চা করে এবং জঙ্গীবাদ ছড়ায়, তাদেরকে যথাসময়ে আইনের আওতায় আনতে তিনি পিছপা হন না।

এই বৈশ্বিক মহামারিতে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়লেও বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থেকেছে। মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ ভারত এবং পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে (২২২৭ মার্কিন ডলার)। সরকারের যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ আজ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ তিনটি দেশের একটিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর দেশ নয়, বরং নিজেই অন্যদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। আইএমএফের ঋণ পরিশোধে অক্ষম দারিদ্রপীড়িত সুদান এবং সোমালিয়ার ঋণ পরিশোধের দায়ভার নিয়েছে বাংলাদেশ। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুসহ দুই পাড়ে অত্যাধুনিক সুপার হাইওয়ে নির্মাণ, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি, কর্ণফুলি নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, মেট্রোরেল, এবং আগামী বছরের শুরুতে দুটি পাতাল রেল তৈরির মতো মেগা প্রকল্পগুলোবাংলাদেশের মজবুত অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। নানারকম দেশি-বিদেশি বাধা-বিপত্তি এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্র সামলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ ও সফল নেতৃত্বের প্রমাণ।

২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার ৫০ বছরে,২০২১ সালের মধ্যে“ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং নির্বাচনে জয় লাভ করে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করলে যারা “ডিজিটাল” শব্দটি নিয়ে নানাভাবে উপহাস করতে শুরু করেছিল, বিগত কয়েক বছর ধরে তারাই সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র এবং গুজবের মাধ্যম হিসেবে সেই ডিজিটাল বাংলাদেশের যথাসাধ্য অসদব্যবহার করে চলেছে। কিন্তু এই করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও সেই ডিজিটাল বাংলাদেশের সদব্যবহার করেই স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া অব্যহত রাখা সম্ভব হচ্ছে। আজকে যারা সরকারকে নানাভাবে খোঁচা দিতে “উন্নয়ন” শব্দটি ব্যবহার করছেন, অদূর ভবিষ্যতে কে জানে কীভাবে এই উন্নয়নকেই তারা সরকার ও রাষ্ট্র বিরোধী কাজে ব্যবহার করে।

জানি না এই করোনাজনিত স্থবিরতা কাটিয়ে উঠে আবার কবে আমরা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ফিরতে পারবো। আমাদের ছেলেমেয়েদের আবার কবে নিরাপদে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে পারবো। যতবেশি মানুষের মধ্যে যতবেশি দ্রুত শুভবুদ্ধির উদয় হবে, রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষে এই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠা ততবেশি সহজ হবে।

আসুন, সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি। করোনাকে ভয় নয়, জয় করি।

মোঃ আশরাফুল ইসলাম
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক,
খুলনা মহানগর আওয়ামীলীগ।

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর