শিরোনাম
ন্যায়বিচার পেতে আমাকে ক্ষমতায় আসতে হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী নরসিংদীতে বাস-কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২ চাঁনমারী এলাকার কিশোর গ্যাং আশিক গ্রুপের দু’সদস্যসহ গ্রেফতার ৫ ফকিরহাটে ২৪ কেজি গাঁজা ও ৩৬০ পিস ইয়াবাসহ চার মাদক কারবারি গ্রেফতার নগরীতে শতাধিক ক্ষুদে শিক্ষার্থীকে বিদ্যাবন্ধু’র শিক্ষা উপকরণ বিতরণ  বাগেরহাটে অগ্নিকাণ্ডে কিশোরের মৃত্যু রামপালে যুবককে মারপিট, টাকা-স্বর্ণের চেইন ছিনতাইের অভিযোগ শিশুর শ্লীলতাহানীর অভিযোগে মামলা, অভিযুক্তকে গণপিটুনি আশাশুনিতে পিকআপ-ইজিবাইক সংঘর্ষে দুই নারী হজ্বযাত্রী নিহত ইউরোপীয়রা জানতো, নির্বাচনে আমিই জিতব : প্রধানমন্ত্রী

এত নিপীড়ন বিশ্বের আর কোথাও হচ্ছে না : মানববন্ধনে বিএনপি নেতারা

খুলনার চিত্র ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত : সোমবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৩

টানা ৪৩ দিন পর আবারও প্রকাশ্যে রাজপথে কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে গতকাল রোববার ঢাকাসহ সারাদেশে মানববন্ধন করেছে দলটি। কোনো কোনো জেলায় কর্মসূচি পালনকালে বাধা, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ স্থানেই শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে।

গত ২৮ অক্টোবরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক নিয়েই এদিন রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হন দলটির হাজারো নেতাকর্মী। হত্যা, নির্যাতন ও নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও এতে অংশ নেন। তবে নেতাকর্মীর ব্যাপক ভিড়ে তারা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি।

কর্মসূচিতে বিএনপি নেতারা বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনে বাংলাদেশ এখন এক নম্বর। হামলা, মামলা করে ১৫ বছর ধরে বিএনপি নেতাকর্মীর ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হচ্ছে। গত এক মাসেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিএনপির প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মীকে। বাবাকে না পেলে ছেলেকে, ছেলেকে না পেলে বাবাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এত নিপীড়ন বিশ্বের আর কোথাও হচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এ মানববন্ধনে সকাল ১০টা থেকেই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, সরকারের পতনসহ নানা স্লোগান দিতে দিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতাকর্মীরা ওই এলাকা সরগরম করে তোলেন।

এতে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘যে যেখান থেকে পারেন, সরকারের বিরুদ্ধে না বলুন। মানুষ না খেয়ে মরছে। ক্ষমতাসীনরা লাঠিয়াল বাহিনী, হেলমেট বাহিনী তৈরি করে জনগণের ওপর অত্যাচার করছে। এটা বেশি দিন চলবে না। বিরোধী নেতাকর্মীরা পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারছে না। অনেকে বনে-জঙ্গলে রাতযাপন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সবাইকে আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সেলিমা রহমান বলেন, ‘মনে সাহস রাখুন, রাজপথে আছি, রাজপথে থাকব। বাম-ডান-মধ্য সবাই এক হয়েছি, এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি।’

এদিকে বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে সকাল থেকেই জাতীয় প্রেস ক্লাবের দু’পাশে কদম ফোয়ারার দিকে এবং পুরানা পল্টনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অবস্থান নেয়। ছিল জলকামান, প্রিজন ভ্যান আর রায়ট কার। তবে এদিন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দুপুর ১২টার আগেই নেতারা বক্তব্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন।

মানববন্ধনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আজ বাংলাদেশে মানবাধিকার ভূলণ্ঠিত, মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কোথাও নেই। এই অবস্থায় সবাইকে অন্যায়, অবিচার ও কুশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।’

বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু ও সহতথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরীর সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, তাহসিনা রুশদীর লুনা, আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, রেহানা আখতার রানু, মীর নেওয়াজ আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ প্রমুখ।

অন্যান্য দল
এদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সিনিয়র নেতা রুহুল আমিন গাজীর নেতৃত্বে আলাদা মানববন্ধন হয়। এ ছাড়া গণতন্ত্র মঞ্চ কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সামনে, ১২ দলীয় জোট, গণঅধিকার পরিষদ (নুর) বিজয়নগরে, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট পুরানা পল্টনে, এলডিপি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, গণফোরাম-পিপলস পার্টি কদম ফোয়ারার কাছে, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে, লেবার পার্টি তোপখানা রোডে, গণঅধিকার পরিষদ (রেজা কিবরিয়া) পুরানা পল্টনে দলের কার্যালয়ের সামনে, এবি পার্টি বিজয়নগরে আলাদাভাবে মানববন্ধন করে।

গণতন্ত্র মঞ্চের কর্মসূচিতে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ভোটাধিকার হরণ করে জনগণের সম্মতি ছাড়া ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে সরকার গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ গায়েবি মামলায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে সর্বাত্মক দমন-পীড়ন করে সর্বজনীন মানবাধিকারের সর্বোচ্চ লঙ্ঘন ঘটিয়ে চলেছে। খেয়াল-খুশিমতো হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, অত্যাচার-নির্যাতন এবং ফরমায়েশি সাজার মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতাকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। অথচ বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন চুপ।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। কিন্তু বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করার ক্ষমতা রাখে না। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ঐক্যবদ্ধ হোন, রাজপথের দখল নিন। তারা তপশিল, নির্বাচন বন্ধ করতে বাধ্য হবে। অপেক্ষা করেন– বেশি সময় নেই এই সরকারকে মানুষ ধাওয়া করবে।

শামীমা-সালমাদের কান্না
এদিন রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেছে বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনগুলো।

ব্যুরো, অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা জানান, বগুড়ায় বিএনপির মানববন্ধনে এসেছিলেন নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা শরিফুল ইসলামের স্ত্রী শামীমা ইসলাম লিমা ও তাঁর দুই সন্তান। পুলিশের দাবি, শরিফুল বিএনপির কর্মী ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু স্ত্রী শামীমার দাবি, তাঁর স্বামী কোনো দলের রাজনীতিতে জড়িত নন। গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় জ্বরে আক্রান্ত আড়াই বছরের মেয়ে হুজাইফার জন্য ওষুধ আনতে বাইরে গিয়ে শরিফুল আর ফেরত আসেননি। রাত ১২টার দিকে প্রতিবেশীর মাধ্যমে শামীমা জানতে পারেন, শরিফুলকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। শরিফুল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর অনুপস্থিতিতে দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। স্বামীর মুক্তির দাবি জানিয়ে এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মানববন্ধনে শামীমার মতো আরও অনেকেই এসেছিলেন। তারা কাঁদতে কাঁদতে কারও স্বামী, কারও বাবাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা বর্ণনা করেন। জেলা বিএনপির  সহসভাপতি আবদুল বাছেদের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে দলের অনেক শীর্ষ নেতা অনুপস্থিত ছিলেন।

খুলনায়ও জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দেখা যায়নি। যশোরে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক নার্গিস বেগমের নেতৃত্বে সহস্রাধিক নেতাকর্মী ও সম্প্রতি নাশকতা মামলায় কারাগারে থাকাদের স্বজনরা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় কাঁদতে কাঁদতে কথা বলেন গ্রেপ্তার দলটির কর্মী নূরনবীর স্ত্রী সালমা আক্তার।

তিনি বলেন, ‘দেড় মাস আগে বিনা অপরাধে আমার স্বামীকে ঢাকা থেকে ফেরার পথে বাস থেকে নামিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি কারাগারে থাকায় আমাদের দিন চলছে না। ছয় মাসের শিশুকে নিয়ে বিপদে আছি। আমার স্বামী বিএনপি করে, এটা কি অপরাধ?’ মানববন্ধনে অন্য অংশগ্রহণকারীরা তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা বিষয় তুলে ধরে বিচার চান।

সিলেটে পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে জেলা ও নগর বিএনপি। দুপুরে আদালত চত্বরে আর সকালে কোর্ট পয়েন্টে সাবেক মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে মানববন্ধন হয়। দুপুরে জেলা ও নগর বিএনপি নেতকর্মীরা সুরমা পয়েন্টে পূর্বনির্ধারিত মানববন্ধন কর্মসূচি শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে বিএনপির নেতাকর্মীরা আদালত চত্বরে কর্মসূচি পালন করেন।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল, রংপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, বগুড়া, বাগেরহাট, কিশোরগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, পঞ্চগড়, পটুয়াখালী, সুনামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ আরও জেলা এবং উপজেলায় এদিন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মানববন্ধন করেন।

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর